নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের আপত্তি এবং সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনার পরও নতুন মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা-২০২৫ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীরা। প্রস্তাবিত এই বিধিমালা কার্যকর হলে দেশের ক্লোজড-এন্ড (মেয়াদি) মিউচুয়াল ফান্ড এবং সামগ্রিক শেয়ারবাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য তারা অর্থমন্ত্রীর জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
শনিবার (২০ জুন) রাজধানীর বিজয়নগরে ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্ট ফোরাম (সিএমজেএফ) কার্যালয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এই দাবি তুলে ধরেন। 'বাংলাদেশ মিউচুয়াল ফান্ড বিনিয়োগকারী ঐক্য ফ্রন্ট' নামের একটি সংগঠন এই সেমিনারের আয়োজন করে।
সেমিনারে সংগঠনের সভাপতি জহুরুল হক জুয়েল অভিযোগ করেন, বিএসইসি চেয়ারম্যানের সুনির্দিষ্ট আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কমিশনের একটি অংশ মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডগুলো বন্ধ অথবা সেগুলোকে ওপেন-এন্ড ফান্ডে রূপান্তর করার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তীব্র শঙ্কা ও বাজারে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে একপর্যায়ে আদালতের স্থিতাদেশ থাকলেও পরবর্তী সময়ে বিএসইসির আবেদনের প্রেক্ষিতে তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এই আইনি পরিবর্তনের পর বিনিয়োগকারীদের ভেতরের উদ্বেগ ও শঙ্কা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
আলোচকদের মতে, শুধু বাজারমূল্যের (ট্রেডিং প্রাইস) ওপর ভিত্তি করে একটি মেয়াদি ফান্ডের অবসায়ন কিংবা সেটিকে ওপেন-এন্ড ফান্ডে রূপান্তর করার সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক রীতিনীতির পরিপন্থী। তারা মনে করেন, বাজারে চলমান লেনদেনের মূল্য কোনো সম্পদের প্রকৃত মূল্য বা নেট অ্যাসেট ভ্যালু নির্ধারণের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না।
বিনিয়োগকারী প্রতিনিধিরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, নতুন 'মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা- ২০২৬' বাস্তবায়িত হলে দেশের ভালো পারফর্ম করা ফান্ডগুলোকেও জোরপূর্বক অবসায়ন কিংবা রূপান্তরের মুখে পড়তে হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের পরিপন্থী।
সেমিনারে জানানো হয়, বর্তমানে দেশের ক্লোজড-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর অধীনে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার তালিকাভুক্ত শেয়ার রয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে বাজারে একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ হিসেবে ভূমিকা রাখছে। জহুরুল হক জুয়েল সতর্ক করে বলেন, এই ফান্ডগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে বন্ধ বা রূপান্তর করা হলে বাজারে বিশাল আকারের শেয়ার বিক্রির চাপ তৈরি হতে পারে, যা সামগ্রিক বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি।
বক্তারা বলেন, এই বিধিমালা অনুযায়ী মেয়াদি ফান্ডগুলোর সম্পদ বিক্রি করে বিনিয়োগকারীদের টাকা ফেরত দিতে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে বাজারে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার শেয়ার বিক্রির চাপ সৃষ্টি হবে। এর সঙ্গে যদি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত বিক্রি যুক্ত হয়, তবে বাজারে বিক্রির মোট চাপ ২০ হাজার কোটি টাকাও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে পুঁজিবাজারে তীব্র তারল্য সংকট দেখা দেবে এবং বাজারের স্থিতিশীলতা পুরোপুরি বিনষ্ট হতে পারে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর বড় ধাক্কা দেবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
পুঁজিবাজারে গত কয়েক বছরে নেওয়া বেশ কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে বাজারসংশ্লিষ্টদের মনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সেমিনারে বক্তারা দীর্ঘমেয়াদি বাজার উন্নয়নের স্বার্থে 'মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা-২০২৫' এবং 'মার্জিন রুলস-২০২৫' পুনর্বিবেচনার জন্য জোরালো দাবি জানান।
বিনিয়োগবান্ধব ও একটি স্থিতিশীল পুঁজিবাজার গড়ে তোলার লক্ষ্যে যেকোনো নতুন নিয়ম বা বিধিমালা চূড়ান্ত করার আগে, তার সম্ভাব্য প্রভাব ও বাজারের বাস্তব পরিস্থিতি সব পক্ষের অংশগ্রহণে আলোচনার মাধ্যমে গভীরভাবে পর্যালোচনা করার আহ্বান জানানো হয়।