ওপেক প্লাস ছাড়ার ঘোষণা আমিরাতের

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রতিবেদন প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬, সময়ঃ ১০:১২

মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি রাজনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তনের সংকেত দিচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দীর্ঘদিনের মিত্র সৌদি আরবের জ্বালানি নীতির বলয় থেকে বেরিয়ে নিজস্ব পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটি। সম্প্রতি ওপেকের (OPEC) কোটা পদ্ধতি ও নিয়ন্ত্রণকে পাশ কাটিয়ে দৈনিক অর্ধকোটি ব্যারেল তেল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে আবুধাবি। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নয়, বরং সৌদি আরবের একক আধিপত্যের বিরুদ্ধে আমিরাতের এক ধরনের ‘রাজনৈতিক বিদ্রোহ’।


পিএসআইএফওএস কনসাল্টিং গ্রুপের এক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আমিরাতের এই সিদ্ধান্ত পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা বা 'টার্নিং পয়েন্ট'। দীর্ঘ সময় ধরে তেলের বাজারের নিয়ন্ত্রণ সৌদি আরবের হাতে থাকলেও, এখন আবুধাবি সেই নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠতে চায়। এর ফলে দেশটি এখন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং এশিয়ার ক্রমবর্ধমান বাজারগুলোর দিকে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তন করছে।

 

সংযুক্ত আরব আমিরাতের মূল লক্ষ্য হলো তেলের দামের চেয়ে বাজারের অংশীদারিত্বকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। যেহেতু তাদের তেল উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম এবং অর্থনীতি বর্তমানে বেশ বৈচিত্র্যময়, তাই তারা কম দামে বেশি পরিমাণ তেল বিক্রি করতে আগ্রহী। ২০৪০ সালের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানির চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কায়, তার আগেই নিজস্ব খনিজ সম্পদকে কাজে লাগিয়ে নিতে চায় দেশটি।

 

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ২০৩০ সালের মধ্যে দৈনিক ৫০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করতে ইতোমধ্যে ১২২ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বিনিয়োগ করেছে আমিরাত। কিন্তু ওপেকের নির্ধারিত কোটা ব্যবস্থার কারণে তারা এতদিন পূর্ণ ক্ষমতায় তেল উৎপাদন করতে পারছিল না। জোট থেকে বেরিয়ে গেলে এই বাধা আর থাকবে না।

 

আমিরাত কেবল তেল উৎপাদন বাড়াতে চায় না, বরং তাদের নিজস্ব ‘মুরবান’ ক্রুডকে বৈশ্বিক তেলের দাম নির্ধারণের একটি মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। যা সরাসরি বিশ্বখ্যাত ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই-এর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে আমিরাতের প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যাবে।

 

আমিরাতের এই সাহসী সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি মনে করেন, এর ফলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম সাধারণ মানুষের নাগালে আসবে। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, ওপেকের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে বাজারে এক ধরণের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) ভেতরেও সৌদি আরবের সঙ্গে আমিরাতের দূরত্ব বাড়তে পারে, যা দেশটিকে রাজনৈতিকভাবে একা করে দেওয়ার ঝুঁকি রাখে।

 

ভারতীয় আর্থিক সংস্থা আইসিআইসিআই সিকিউরিটিজের মতে, হরমুজ প্রণালির বর্তমান অস্থিরতার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে বড় পরিবর্তন না এলেও দীর্ঘমেয়াদে আমিরাতের এই সিদ্ধান্তে তেলের দাম কমতে পারে। এর ফলে ভারত ও চীনের মতো বড় ক্রেতা দেশগুলোর সঙ্গে সরাসরি লাভজনক চুক্তিতে যাওয়ার সুযোগ পাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত।

 

সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের তেলের বাজারে সৌদি আরবের একক নিয়ন্ত্রণের দিন শেষ হয়ে এখন এক নতুন বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে পুরো বিশ্ব।