জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বিএনপির ভূমিকা: সমর্থন, কৌশল ও রাজপথের সক্রিয়তা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রতিবেদন প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬, সময়ঃ ১২:৫৩

২০২৪ সালের ১ জুলাই সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মাধ্যমে যে স্ফুলিঙ্গের সূচনা হয়েছিল, তা দ্রুতই রূপান্তরিত হয় শতাব্দীর অন্যতম বড় ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতন ঘটে। এই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক রূপান্তরে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ভূমিকা, কৌশল এবং ত্যাগ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


কৌশলগত অবস্থান ও প্রথম আনুষ্ঠানিক সমর্থন
আন্দোলনের প্রথম দিকে এটি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে পরিচালিত হচ্ছিল। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শেষে ২০২৪ সালের ৬ জুলাই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিএনপি ছাত্র সমাজের কোটা সংস্কারের যৌক্তিক দাবিতে প্রথম আনুষ্ঠানিক সমর্থন জানায়। দলটির নীতি-নির্ধারকরা জানান, শুরুতে আন্দোলনের নেতৃত্ব পুরোপুরি শিক্ষার্থীদের হাতে রাখতেই তারা সরাসরি দলীয় ব্যানার ব্যবহার করা থেকে বিরত ছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, তৎকালীন সরকার যেন এই আন্দোলনকে রাজনৈতিক ট্যাগ দিয়ে নস্যাৎ করার সুযোগ না পায়।


রাজপথে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ও সমন্বয়
জুলাইয়ের মধ্যভাগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্বিচার গুলিবর্ষণ ও ব্যাপক হত্যাকাণ্ড শুরু হলে বিএনপি তাদের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সরাসরি আন্দোলনে অংশ নেওয়ার নির্দেশ দেয়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার থেকে নানা অপপ্রচারের চেষ্টা করা হলেও বিএনপি রাজপথে সংহতি বজায় রাখে। আন্দোলনের নীতিনির্ধারণী ধাপে, বিশেষ করে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির সময়সূচি পুনর্নির্ধারণসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধী দলীয় শীর্ষ নেতাদের সাথে সমন্বয়কদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিল।


গ্রেপ্তার, প্রাণহানি ও অঙ্গ-সংগঠনের ভূমিকা
আন্দোলন দমনে তৎকালীন প্রশাসন বিরোধী শিবিরের ওপর ব্যাপক চিরুনি অভিযান চালায়। আন্দোলনের সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ নেতাসহ সারা দেশে অন্তত ৯ হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সাথে ১৬ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে রাজধানীসহ দেশজুড়ে সহিংসতায় বিএনপির অঙ্গ-সংগঠন বিশেষ করে ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা সম্মুখ সারিতে অবস্থান নেন। ছাত্রদলের ১৪২ জন নেতাসহ জুলাই-আগস্টে বিএনপির সর্বমোট ৪২২ জন নেতাকর্মী প্রাণ হারান বলে দলটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।


‘মাস্টারমাইন্ড’ বিতর্ক ও রাজনৈতিক দর্শন
গণঅভ্যুত্থানের নেপথ্য নায়ক বা ‘মাস্টারমাইন্ড’ কে—এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা থাকলেও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এটিকে গণতান্ত্রিক মানুষের এক সম্মিলিত লড়াই হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের স্বৈরাচারবিরোধী লড়াইয়ের ধারাবাহিক পরিণতিই হলো এই জুলাই গণঅভ্যুত্থান।


পরবর্তী সংস্কার ও ভবিষ্যৎ ভাবনা
গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার পাশাপাশি যে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে কাজ করার কথা প্রকাশ করেছে বিএনপি। দলটির নেতারা মনে করেন, নির্বাচিত সরকার গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই 'জুলাই সনদ' ও নতুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংস্কারগুলো পর্যায়ক্রমে সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।